
১৮১৭ সালে সামাজিক গবেষক ও শিল্প-সংস্কারক রবার্ট ওয়েন সময় ব্যবস্থাপনার একটি ঐতিহাসিক নিয়ম নির্দেশ করেন—Eight hours work, Eight hours recreation, Eight hours rest।
দুই শতাব্দী পর আজ আধুনিক নিউরোসাইন্স ও বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমীক্ষায় এই ৮-৮-৮ বিন্যাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সুনির্দিষ্টভাবে উঠে এসেছে।
সকালে তাড়াহুড়ো করে দিন শুরু না করে ৬:৩০ থেকে ৭:০০ টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠুন। এই সুন্দর সময়টুকুতে নিজের মনের মতো কাজ করুন—ধর্মীয় উপাসনা, হালকা শরীরচর্চা, প্রিয় মিউজিক শোনা, গাছে পানি দেওয়া এবং ধীরে-সুস্থে পুষ্টিকর প্রাতরাশ শেষ করা।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA)-র গবেষণা অনুযায়ী, সকালে দিনের শুরুতেই কোনো তাড়াহুড়ো না করে নিজস্ব সময় কাটানো মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা কমায় এবং সারাদিনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ৯:০০ টার দিকে শান্ত ও সতেজ মস্তিষ্কে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিন।
পেশাগত দায়িত্ব ও সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা
অফিসের নির্দিষ্ট ৮ ঘণ্টা সময় আপনার সেরা আউটপুট দেওয়ার সময়। দিনের শুরুতেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে শেষ করুন। কাজের ফাঁকে অনাকাঙ্ক্ষিত গসিপ কিংবা চা, পান ও সিগারেটের বাহানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করা পেশাদারিত্বের পরিচয় নয়।
জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড সাইকোলজি-র সমীক্ষা অনুযায়ী, কাজের মাঝে অপ্রাসঙ্গিক আড্ডায় বারবার দীর্ঘ বিরতি নিলে মস্তিষ্কের মনোযোগ গভীর রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয় এবং কাজের গতি অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। সারাদিন অলস সময় কাটিয়ে বসের দৃষ্টি আকর্ষণ বা অতিরিক্ত কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য লেট-নাইট কাজ করা বা ছুটির দিন নষ্ট করা স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী মানুষের কর্মক্ষমতা শূন্যে নামিয়ে আনে।
কাজ শেষ করে অফিসের চিন্তা অফিসে রেখে বাসায় ফিরুন। ফ্রেশ হয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ডিনার করা, সন্তানদের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটানো, তাদের পড়াশোনা ও সারাদিনের অভিজ্ঞতা শোনা এবং বাড়ির বয়বৃদ্ধদের খোঁজখবর নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এরপর আগামীকালের প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গুছিয়ে রাখুন।
হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট (৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত বিশ্বের দীর্ঘতম গবেষণা)-র মূল তথ্য অনুযায়ী, ক্যারিয়ারের পদবি বা অর্থের সাথে সাথে পরিবার ও প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্কের গভীরতাই মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার মূল চালিকাশক্তি। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (AAP)-র ডেটা নির্দেশ করে, বাবা-মায়ের সান্নিধ্য ও নিয়মিত পারিবারিক যোগাযোগ শিশুদের ইমোশনাল বুদ্ধিমত্তা বাড়ায় এবং আচরণগত মানসিক সমস্যা থেকে দূরে রাখে।
মানসম্মত ঘুম ও নিউরোসাইন্স –
কাজের অজুহাতে ঘুমকে অবহেলা করা বা রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত জেগে থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। রাত ১১:০০ টার মধ্যে বিছানায় যান, যেন সকাল ৬:৩০ থেকে ৭:০০ টার মধ্যে পর্যাপ্ত ঘুম শেষে উঠতে পারেন।
নেচার জার্নাল এবং ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি-র ১,০০,০০০ মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও মেধা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখতে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার ঘুম আবশ্যক।
সাইন্স ট্র্যান্সলেশনাল মেডিসিন-এ প্রকাশিত নিউরোসাইন্স গবেষণায় দেখা যায়, ঘুমের সময় মস্তিষ্কের গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম সচল হয়ে সারাদিন জমে থাকা প্রোটিন ওয়েস্ট ও মেধা-ক্লান্তি দূর করে ব্রেইনকে শার্প রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘুমকে অবহেলা করে টানা অতিরিক্ত কাজ করলে হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭% এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং সময়মতো ঘুমানোই আসল সচেতনতা ও স্মার্টনেস।
তথ্যসূত্র :
১. https://www.bl.uk/learning/histcitizen/21cc/working/workingclass/robertowen/robertowen.html
২. https://www.apa.org/news/press/releases/stress
৩. https://psycnet.apa.org/journal/apl
৪. https://mira.stanford.edu/sites/g/files/sbiybj26401/f/pencavel_productivity_of_hours_worked.pdf
৫. https://www.adultdevelopmentstudy.org/
৬. https://www.aap.org/
৭. https://www.sciencedaily.com/releases/2018/10/181009135824.htm
৮. https://www.science.org/doi/10.1126/science.1241224
৯. https://www.who.int/news/item/17-05-2021-long-working-hours-increasing-deaths-from-heart-disease-and-stroke-who-ilo